domarnews24.com

বেদনার স্মৃতি বুকে নিয়ে ফাতেমার জীবনসংগ্রাম

  • Update Time : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
  • ১১৪ Time View

বড় ছেলে আবদুল্লাহ বিন জাহিদ শহীদ হন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে। এরপর ৫ দিন পর একমাত্র ছোট ছেলে জিসানের কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে। নিদারুণ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বছরখানেক পর স্ট্রোক করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন স্বামীও। সম্পর্কের টানাপোড়েন হয় পরিবার-স্বজনদের সঙ্গেও। নির্মম এই বাস্তবতায় ফাতেমা-তুজ-জোহরার বিরামহীন লড়াই শুরু হয় বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছোট ছেলে জিসানকে নিয়ে। চিকিৎসার জন্য প্রতি মুহূর্তে তৎপর থাকা, হাসপাতালের করিডর, চিকিৎসকের কক্ষ, টেস্ট রিপোর্ট, কেমোথেরাপি, চিকিৎসার টাকা সংগ্রহ-সবকিছু মিলিয়ে এটা যেন তার জীবনের এক বিরামহীন যাত্রা হয়ে উঠেছে।

মা দিবস উপলক্ষ্যে শোকে কাতর সংগ্রামী এই নারীর খোঁজ নিতে শনিবার দুপুরে যুগান্তরের পক্ষ থেকে রাজধানীর উত্তরখানে তার বাসায় গিয়ে দেখা যায় ছেলে ও স্বামী হারানোর শোকে কাতর ফাতেমার চোখের নিচে কলি পড়ে গেছে। চল্লিশ বছরের এই মানুষটার চেহারা মলিন হয়ে গেছে। শরীরে তার প্রচণ্ড ক্লান্তি কিন্তু একজন মা হিসাবে জিসানের জন্য সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।

কথার সূত্র ধরে তিনি দেখালেন আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা বড় ছেলে শহীদ আবদুল্লাহর পুরোনো কাপড়। কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে রাখা আছে ক্রমান্বয়ে ছেলের বেড়ে ওঠার স্মৃতিময় ছবি। শোপিসে রাখা আছে তার পছন্দের খেলনা, নানা রকমের ছোট ছোট গাড়ি। ঘরের দেওয়ালে ঝুলানো আছে স্বীকৃতি-স্মারক। আরেক প্রান্তে স্কুলব্যাগ, জুতা; সবকিছু। এসব কিছু প্রতি মুহূর্তে পরিচ্ছন্ন রাখেন মা ফাতেমা-তুজ-জোহরা। কোনো স্বজন কিংবা শুভানুধ্যায়ী গেলে ছেলের স্মৃতি রোমস্থন আর অনবরত কান্না করেন।

অসহায়ত্ব নিয়ে বললেন, আমার এত সাধনার সন্তান আবদুল্লাহ কীভাবে নাই হয়ে গেল! কীভাবে নরপিশাচরা মেরে ফেলল! চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, ‘১৬ বছরের আবদুল্লাহ তখন রমিজ উদ্দিন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সে জুলাই আন্দোলনের সময় আমাকে না বলে যেত। বোঝাত সে এসবের কোনো কিছুতে নেই। একবার মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে ঘরে প্রবেশ করায় আমার চোখ তো কপালে! বাবা কী হয়েছে বলতেই, ও গুছিয়ে মিথ্যা কথাটা বলল-আম্মু-মা রিকশা থেকে পড়ে গেছিলাম। ও আমাকে আম্মু-মা বলত। আমি বাবা বলতাম। খুব ছোটবেলায় বাবা হারিয়েছি তো…! বলেই চোখ মুছলেন!

ফাতেমা-তুজ-জোহরার ভাষ্য, ৫ আগস্ট দিনভর ছটফট করতে থাকে সে। দুপুরের দিকে জানায় সেনাপ্রধান বক্তব্য দেবে। টিভি দেখার জন্য অস্থির হয়ে যায়। যথারীতি সেনাপ্রধানের ঘোষণার পর দ্রুত ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজয় মিছিলে যেতে চায়। আমি নিরাপদ মনে করে অনুমতি দিয়ে বলি, দ্রুত চলে আইসো বাবা। পরে আর আমার সাতরাজার ধন, আমার দুরন্ত বাবাটা ফিরে আসে নাই। তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের চূড়ান্ত ফল দেখার আগেই শহীদ হয় আবদুল্লাহ বিন জাহিদ।

তখন গলা ভারী হয় আসে তার। থামেন। এরপর আবার বলতে শুরু করেন, তিল তিল করে গড়ে তোলা আমার ছেলেটার লাশ দেখতে হবে!

প্রাণবন্ত ছেলেটা চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে যাবে-আমি কোনোদিন ভাবি নাই। বলে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন! বললেন, আমার মুখ মলিন দেখলে আমার গালের সঙ্গে ওর গাল রেখে বলত আম্মু-মা হাসো হাসো! এখন কেউ আর এভাবে বলে না! আমার কষ্টেরও শেষ হয় না!

কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, আবদুল্লাহ চাচা-ফুপু সবার আদরের ছিল। চাচা-ফুপুরা সবাই দেশের বাইরে থাকেন। দেশের বাইরে থাকায় ওর জন্য সুন্দর সুন্দর উপহার ও জামাকাপড় আসত। এখন আবদুল্লাহ নেই। আমার স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরাও আগের মতো নেই-বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন তিনি।

‘এমন অসহায় এই দুনিয়ায় কজন আছে জানি না’ : আমার মতো দুঃখী, এমন অসহায় এই দুনিয়ায় কজন আছে জানি না, বললেন ফাতেমা। আবদুল্লাহ শহীদ হওয়ার ৫ দিন পর জানা গেল ছোট ছেলে জিসানের কোলন ক্যানসার। বড় ছেলের মৃত্যু, ছোট ছেলে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। এত কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পরের বছর মার্চ মাসে ওর বাবা স্ট্রোক করে মারা যায়। বলেই ফের কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাতেমা-তুজ-জোহরা। হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, আমি বেঁচে আছি চারদিক থেকে তেড়ে আসা ক্রমাগত কষ্ট সহ্য করার জন্য। এত কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকা যায়? এমন প্রশ্ন রেখে আবার বলতে শুরু করেন, আমার জিসান কতদিনের মেহমান জানি না। শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি আমার আগে এই সন্তানটাকে কেড়ে নিও না। আর শোক সহ্য করার ক্ষমতা নাই আমার।

এরপর এলোমেলো বক্তব্য শুরু। অনেকটা প্রলাপের মতোই। এই যে, আমার ছেলে আবদুল্লাহর ছোটবেলার ছবি। কালো ওর পছন্দের কালার ছিল। কিন্তু শেষদিন জাম রঙের কাপড় পরতে চেয়েছিল। আমার পায়ের কাছে মাথা রেখে ও ঘুমাত! এরপর এখানে মাথা রেখে আর কেউ ঘুমায় না! আমার ছোট ছেলেও না! বলেই আবার কান্না শুরু।

কান্না থামার পর জানালেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তার স্বামী কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর চলে যান। সেখানে একটা ঘর করেন। পুরো পরিবার নিয়ে যেতেও চেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকা মানুষটা গ্রামেই মধ্যবিত্তের শেষ জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। ফাতেমা যেতে চাননি। সন্তানদের ঢাকায় পড়িয়ে মানুষ করাবেন। এ নিয়ে স্বামীর সঙ্গে তৈরি হয়েছিল দূরত্ব। সন্তান শহীদ হওয়ার পর শুধু বলেছিলেন, ‘তোমার কাছে বড় ছেলেকে রেখে আসলাম, তুমি রাখতে পারলা না।’ ফাতেমা বলেন, আমার কাছে এর কোনো জবাব ছিল না। আমি শুধু দু-হাত সামনে রেখে মাফ চেয়ে নিয়েছি। আবদুল্লাহ মারা যাওয়ার পর ওদের বাবা প্রায় বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। নামাজ পড়ে এলাকার দোকানে বসে কান্নাকাটি করতেন। একপর্যায়ে তো মারাই গেলেন।

‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর কাছে কৃতজ্ঞ : ফাতেমা জানান, এখন তার প্রাত্যহিক রুটিন ছোট ছেলেকে বাঁচানোর লড়াই। তার জীবনের আরেক নাম হয়ে যাচ্ছে বিরামহীন যাত্রা। তবে দুঃসহ এই যাত্রার খবর পেয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে ‘আমরা বিএনপি পরিবার।’ সার্বিক চিকিৎসার খরচ বহন করছে সংগঠনটি। তিনি জানান, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে থাকা অবস্থায় তাকে গুলশান কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার সঙ্গে তিনি ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন। ফাতেমা বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আরও দুদিন আমাকে এবং জিসানকে নিয়ে যান। জিসানের ভিডিও গেম পছন্দ শুনে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’র পক্ষ থেকে গেম বক্স, পরার জন্য গেঞ্জি কিনে পাঠান। আমরা বিএনপি পরিবার আমার খোঁজ না নিলে এই কঠিন জীবন কীভাবে পাড়ি দিতাম? এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ আমরা বিএনপি পরিবারের কাছে চিরঋণী।

এদিকে একটি ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘এই পরিবারটির হৃদয়বিদারক ঘটনা জানার পর আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনকে দায়িত্ব দিই পরিবারটির খোঁজ নেওয়ার। আমি বললাম, তুমি যাও। গিয়ে পরিবারটির বিষয়ে আমাকে জানাও। রুমন সেখানে যায়। অসম্ভব অসহায়ত্বের ঘটনা আমি জানলাম এবং আমরা পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম।’

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © Domar News 24
Design & Development By HosterCube Ltd.